ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ড. ইউনুসকে রাষ্ট্রপতি করবে বিএনপি? নেপথ্যে কি নতুন ক্ষমতার সমীকরণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 8, 2026 | ফটো কার্ড | সংবাদটি দেখেছেন: 324
ড. ইউনুসকে রাষ্ট্রপতি করবে বিএনপি? নেপথ্যে কি নতুন ক্ষমতার সমীকরণ ছবির ক্যাপশন : তারেক রহমান ও ড. ইউনুস
বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর এখন সামনে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাষ্ট্রপতি পদে বসবেন কে?
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা নিয়ে যতটা আলোচনা হচ্ছে, তার আড়ালে রাষ্ট্রপতি পদটিও হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। আর সেই সমীকরণে সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাব্য নামগুলোর একটি ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত খবর নয়; বরং রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান আলোচনা, সম্ভাব্য সমীকরণ ও কৌশলগত হিসাবের বিষয়।

কেন ইউনূসের দিকে যেতে পারে বিএনপি?
বিএনপি যদি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়কে জাতীয় ঐকমত্যের রাজনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে ড. ইউনূস হতে পারেন একটি প্রতীকী পছন্দ। তিনি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের দীর্ঘদিনের নেতা নন। ফলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হলে বিএনপি বলতে পারবে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা একজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এটি বিএনপির জন্য দেশ-বিদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করতে পারে।

ড. ইউনূসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি। নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মতো একজন ব্যক্তিকে বসালে নতুন সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি প্রতীকী সুবিধা তৈরি হতে পারে এমন হিসাব বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় থাকতেই পারে।

তাহলে বিএনপি তাঁকে নাও নিতে পারে কেন?
বিএনপির জন্য রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে রাজনৈতিক আস্থা। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও নীতিগত সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিএনপি যদি মনে করে—রাষ্ট্রপতি হিসেবে একজন সম্পূর্ণ অদলীয় ব্যক্তির সঙ্গে ভবিষ্যৎ সরকারের সমন্বয় অনিশ্চিত হতে পারে, তাহলে দলটি নিজেদের রাজনৈতিকভাবে আস্থাভাজন কাউকে বেছে নিতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বিএনপি কি রাষ্ট্রপতি পদে ‘নিজের মানুষ’ চাইবে? এখানে দলীয় রাজনীতির স্বাভাবিক হিসাব কাজ করবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা-হামলা ও সাংগঠনিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা কোনো প্রবীণ বিএনপি নেতাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে দলের অভ্যন্তরে তার গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই বেশি হতে পারে। এতে বিএনপির সরকার ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয়ও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কিন্তু এর বিপরীত যুক্তিও রয়েছে।
যদি বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় ব্যক্তিকে বসায়, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রশ্ন তুলতে পারে
“জাতীয় ঐকমত্যের কথা বলে ক্ষমতায় এসে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদেও কি দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে?”
অন্যদিকে ড. ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করলে বিএনপির সামনে আবার ভিন্ন প্রশ্ন দাঁড়াবে। “সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও নীতিগত দূরত্ব তৈরি হলে তার দায় নেবে কে?” অর্থাৎ দুই পথেই রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যদি বিএনপি মনে করে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে ড. ইউনূস এই সমীকরণ আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, তাহলে ইউনূসের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
কারণ একজন হবেন নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিনিধি, অন্যজন হবেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অদলীয় ব্যক্তিত্ব।

এটি বিএনপির জন্য একটি “রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা” মডেল তৈরি করতে পারে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দুই কেন্দ্রের মধ্যে যদি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক মতপার্থক্য তৈরি হয়, তাহলে সেটি সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করলে বিএনপির রাজনৈতিক লাভের সুযোগ রয়েছে যেমন:
জাতীয় ঐকমত্যের শক্তিশালী বার্তা দেওয়া সম্ভব। আন্তর্জাতিক মহলে নতুন সরকারের গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক তৈরি হতে পারে। ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতার একটি প্রতীকী সংযোগ তৈরি হতে পারে। এছাড়াও বিএনপি দেখাতে পারে যে তারা রাষ্ট্রীয় পদকে কেবল দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করছে না।

আবার ঝুঁকিও কম নয় এক্ষেত্রে সরকার ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভবিষ্যৎ মতপার্থক্যের সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির নিজস্ব নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে ভবিষ্যতে বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিএনপির সিদ্ধান্তের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এছাড়া ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করা হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিতর্কগুলোও নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় আসতে পারে।

ড. ইউনূস রাষ্ট্রপতি হবেন কি না—এই মুহূর্তে সেটি নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য নেই। বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দুটি সম্ভাবনা স্পষ্ট।
প্রথম সম্ভাবনা: বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দিলে ড. ইউনূসের নাম গুরুত্ব পেতে পারে। দ্বিতীয় সম্ভাবনা: বিএনপি যদি সরকার পরিচালনায় রাজনৈতিক সমন্বয়, দলীয় আস্থা ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি পদে নিজেদের রাজনৈতিক বলয়ের কাউকেই বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সুতরাং এই মুহূর্তে আসল লড়াই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বা পক্ষে নয়। লড়াইটি মূলত দুটি রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে।

একদিকে জাতীয় ঐকমত্যের প্রতীকী রাষ্ট্রপতি, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও সমন্বয়পূর্ণ রাষ্ট্রপতি। আর এই জায়গাতেই ড. ইউনূসের নামটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি কাকে বেছে নেয়, সেটিই বলে দেবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা ঐকমত্যের পথে হাঁটতে চায়, আর কতটা নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করতে চায়।
ড. ইউনূস কি রাষ্ট্রপতি হবেন? উত্তর এখনো অজানা। কিন্তু তাঁর নামকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন ইতোমধ্যে সামনে এনে দিয়েছে।

রুবাইয়া জান্নাত 
লেখক

নিউজটি পোস্ট করেছেন : দেশজনতা

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য
দেশজনতা

দেশজনতা

প্রতিবেদকের মোবাইল : 01515661574
সিরাজগঞ্জে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ উপলক্ষে পথসভা, ডিসি-এসপিকে

সিরাজগঞ্জে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ উপলক্ষে পথসভা, ডিসি-এসপিকে