নীলফামারী প্রতিনিধি:
ঢাকায় নিজ কক্ষে রাকিব ইসলাম (১৭) নামে এক কিশোরকে হত্যার পর তার মরদেহ কার্টনে ভরে নীলফামারীর ডিমলায় নিজ গ্রামের বাড়ির পাশে মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল্লাহ মামুন নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। হত্যার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবকে জীবিত দেখিয়ে ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠানো এবং ওই ভিডিও দেখিয়ে মুক্তিপণ দাবিরও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত মামুনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিমলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকা থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত রাকিব ইসলাম টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হামনগর ইউনিয়নের উদ্যমপুর গ্রামের খাদেমুল ইসলামের দ্বিতীয় ছেলে। অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মামুন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকার আফসার আলীর ছেলে।
নিহতের ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন জানান, রাকিবকে জীবিত ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে মামুন কয়েক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। ভাইকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবার চার লাখ টাকা দেওয়ার পরও রাকিবকে ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকার কাফরুল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
পুলিশের তদন্তের একপর্যায়ে গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল্লাহ মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানা গেছে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে রাকিব হত্যার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর রাকিবের পরিবারের পক্ষ থেকে কাফরুল থানায় মামলা করা হয়। মামলাটির ডিএমপি মামলা নম্বর-০৫, তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৬।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামুনকে ডিমলার ছাতনাই বালাপাড়া এলাকায় নেওয়া হয়। তার দেখানো স্থান অনুযায়ী রাকিবের মরদেহ মাটিচাপা দেওয়ার জায়গা শনাক্ত করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে ৬ অক্টোবর দুপুর ১টার দিকে ওই স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহটি ডিমলা থানায় নেওয়া হয়।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার শুক্রাবাদে রাকিবের সঙ্গে আব্দুল্লাহ মামুনের পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার একটি কক্ষে দুজনের মধ্যে বিরোধের একপর্যায়ে রাকিবকে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যার পর রাকিবের মরদেহ একটি কার্টনে ভরে বাসা থেকে বের হন মামুন। পরে ঢাকার কল্যাণপুর থেকে রংপুরগামী একটি গাড়িতে ওঠেন তিনি। কার্টনের ভেতরে কী রয়েছে জানতে চাইলে সেখানে ইলিশ মাছ রয়েছে বলে জানান। রংপুরে পৌঁছে লোকাল বাসে করে ডিমলায় যান। পরে মরদেহটি নিজ বাড়িতে নিয়ে বসতবাড়ির দক্ষিণ পাশে কার্টনসহ মাটিচাপা দিয়ে রাখেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার আরেকটি আলোচিত দিক হলো, রাকিবকে হত্যার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে জীবিত দেখিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। ওই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে রাকিব জীবিত রয়েছে—এমন ধারণা তৈরি করে মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের দাবি, রাকিবকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় তারা চার লাখ টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরে পাননি।
এ ঘটনায় রতন (২৬) ও নুর জামাল (২৫) নামে আরও দুই ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য মামুনের কাছ থেকে পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তবে তাদের সম্পৃক্ততা ও ঘটনার সঙ্গে তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা এখনো তদন্তাধীন।
এদিকে অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় ও দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অভিযুক্ত মামুন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত—এমন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা প্রমাণ ছাড়া তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কোনো দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা হয়েছে। মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের পর মরদেহ উদ্ধারে ডিমলা থানা পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়। পরে ডিমলা থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধারে সহযোগিতা করে।
উদ্ধার করা মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, রাকিব হত্যার প্রকৃত কারণ, মুক্তিপণের টাকা কীভাবে লেনদেন হয়েছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিডিও তৈরির সঙ্গে কারা জড়িত এবং রতন ও নুর জামালসহ অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ হলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য জানা যেতে পারে।